শেষ কবে এমন টেস্ট দেখা গেছে? ধারাভাষ্যকার হার্শা ভোগলের ভাষায়, এ তো খেলা নয়, যেন অমৃত সুধা। ৫৬ মিনিটের রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা। একটা করে উইকেট পড়ছিল, একটা করে রান হচ্ছিল আর হৃদস্পন্দন বাড়ছিল। ভাঙা কাঁধ নিয়ে ব্যাটিংয়ে নেমে সে উত্তেজনাকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যান ক্রিস ওকস। এমন টেস্ট না দেখলে তো আপনি খেলাই ভালোবাসেন না! যেখানে অবিশ্বাস্য নাটকীয়তায় প্রত্যাবর্তন ঘটে ভারতের। এক এই ঘুরে দাঁড়ানোর নায়ক মোহাম্মদ সিরাজ। দুর্দান্ত ইয়র্কারে গাস অ্যাটকিনসনের অফস্টাম্প উড়িয়ে নাটকীয় সিরিজের মহানাটকীয় সমাপ্তি টানেন তিনি। ভারতের ৬ রানের জয়ে ২-২ ব্যবধানে শেষ হলো পাঁচ টেস্টের সিরিজ।
অ্যাটকিনসনকে বোল্ড করে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর আইকনিক ‘সিউউ’ উদযাপন করলেও পরক্ষণেই দুই হাত তুলে মহাশূন্যের দিকে তাকিয়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন সিরাজ। এটা না হলে যে ভিলেন হয়ে থাকতে হতো তাঁকে। চতুর্থ দিনে সেঞ্চুরি করে ইংল্যান্ডকে ম্যাচে ফেরানো হ্যারি ব্রুকের ক্যাচ হাতে জমালেও সিরাজের পা বাউন্ডারি লাইন স্পর্শ করে ফেলেছিল। সেই প্রায়শ্চিত্তই যেন করলেন দলকে জিতিয়ে।
গতকাল ইংল্যান্ডের পতন হওয়া ৪ উইকেটের তিনটিই নিয়েছেন এ পেসার। আগের দিনের দুটি যোগ করলে দ্বিতীয় ইনিংসে ৫ উইকেট তাঁর। ওভালের সবুজ উইকেটে ৪ উইকেট নিয়ে তাঁকে দারুণ সঙ্গ দিয়েছেন আরেক পেসার প্রসিধ কৃষ্ণা। পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে সিরাজের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন ভারত অধিনায়ক শুভমান গিল, ‘তাঁর মতো একজনকে দলে পাওয়া যে কোনো অধিনায়কের স্বপ্ন। প্রতিটি বল, প্রতিটি স্পেল সে নিজেকে উজাড় করে দেয়। কখনোই হাল ছাড়ে না।’
হায়দরাবাদের ছেলে এবং মুসলিম বলে সতীর্থরা ‘মিয়া’ নামে ডাকে সিরাজকে। ইংল্যান্ডের মাটিতে এমন পারফর্ম করে তিনি এখন ভারতের ‘বড় মিয়া’ হয়ে গেছেন। দুই দল মিলিয়ে সিরাজই একমাত্র পেসার, যিনি সিরিজের পাঁচটি টেস্টই খেলেছেন। সবচেয়ে বেশি ১১১৩ বল করেছেন। সিরিজের সর্বোচ্চ ২৩ উইকেট নিয়েছেন।
পঞ্চম দিনের পরিসংখ্যানটা ছিল স্পষ্ট। ওভাল টেস্ট ও সিরিজ জিততে ইংল্যান্ডের প্রয়োজন ৩৫ রান। আর সিরিজ ড্র করতে ভারতের দরকার ৪ উইকেট। এমন পরিস্থিতিতে মাঠে নেমে গতকাল দিনের প্রথম দুই বলেই দুই চার মেরে দেন জেমি ওভারটন। এমন শুরুতে উল্লসিত হয়ে ওঠে স্বাগতিক শিবির। তবে যিনি ছিলেন ইংল্যান্ডের মূল ভরসা, সেই জেমি স্মিথকে পরের ওভারে আউট করে ইংল্যান্ডকে দিনের প্রথম ধাক্কা দেন সিরাজ। ওভালের মেঘলা কন্ডিশনে সিরাজের আউট সুইং তাঁর ব্যাটে চুমু দিয়ে চলে যায় কিপারের গ্লাভসে। পরের ওভারে জেমি ওভারটনকে এলবির ফাঁদে ফেলেন সিরাজ। জাস্টিন টংকে বোল্ড করে দেন প্রসিধ।
৩৫৭ রানে নবম উইকেট পতনের পর উইকেটে আসেন ক্রিস ওকস, যার স্লিংয়ে ঝোলানো বাঁ হাতটা লুকানো ছিল সোয়েটারের ভেতর। তাঁকে নিয়ে ক্যালকুলেটিভ ব্যাটিংয়ে অবিশ্বাস্য প্রদর্শনীতে ওকসকে টানা ১৩ বল ননস্ট্রাইক প্রান্তে রাখেন অ্যাটকিনসন। তবে ওই রানগুলো নেওয়ার সময় ওকসের যন্ত্রণাকাতর মুখ দেখে ভয়ই লেগেছে, বল মোকাবিলা করতে গিয়ে না আবার দুর্ঘটনা ঘটে যায়!
এমনি শঙ্কা-সম্ভাবনার দোলাচলে জয়ের জন্য ইংল্যান্ডের যখন মাত্র ৭ রান প্রয়োজন, তখনি দুর্দান্ত এক ইয়র্কারে অ্যাটকিনসনের অফস্টাম্প উড়িয়ে দেন সিরাজ। এরপর তাঁকে ঘিরে উল্লাসে মেতে ওঠেন শুভমান, রাহুল, জাদেজারা। ম্যাচের পর শুভমান বলেন, ‘গতকাল (চতুর্থ দিন) আমরা ইংল্যান্ডকে চাপে ফেলে দিয়েছিলাম। আজ সে চাপ ধরে রাখতে চেয়েছিলাম। গত ছয়টি সপ্তাহ আমরা কোনো ছাড় দেইনি।’